• শনিবার ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম

    স্বপ্নচাষ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন  

    সুফিয়া ডেইজির প্রবন্ধ ‘বয়সের ভারে যখন’

    স্বপ্নচাষ ডেস্ক

    ২৯ মে ২০২০ ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ

    সুফিয়া ডেইজির প্রবন্ধ ‘বয়সের ভারে যখন’

    সংগৃহীত ছবি

    অধিকাংশ মানুষ মা-বাবাকে নিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে অনেক কথায় লিখেন, অনেকে আবার সেগুলো পড়ে অনেক কষ্ট ও পেয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তব কি সত্যিই তাই! অন্যের ঘরের যন্ত্রণাকে আমরা যতটা আবেগ ভরে উপলব্ধি করি ততটা কি নিজের ঘরের জন্য করি?

    আমার মনে হয় নিজের ঘরের কষ্টগুলো তখন ভীষণ সাদামাটা আর স্বাভাবিক মনে হয়। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া জীবনের সব ছোট ছোট ঘটনায় জড়িয়ে রয়েছে দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ যার বহিঃপ্রকাশ হয় ভালো লাগা আর মন্দ লাগা দিয়ে। কিন্তু যখন মা-বাবা নামক অতি সচেতন আর গুরুত্বপূর্ণ শব্দদ্বয় এসে যায় তখন বিষয়টা ভিন্ন মাত্রায় গিয়ে দাঁড়ায়। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই শব্দদ্বয় যতটা সুক্ষ্মতা আনে প্রয়োগ ক্ষেত্রে ততটাই কি গতিময়তা আসে? আমার মতে আমাদের সমাজে মা-বাবাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া জীবনের বৈশিষ্ট্য গুলো দুই ধরনের

    ধনী পরিবারের মা-বাবার বৈশিষ্ট্য
    গরীব পরিবারের মা-বাবার বৈশিষ্ট্য

    ধনী পরিবারের আবার দুই ভাগ আছে বাস্তবিক ধনী আর ধনীর মতো জীবন যাপন এ অভ্যস্ত ধনী (যাকে বলে অধিক অর্থ নেই বিত্ত নেই তবুও যাপন ধনীর ন্যায়)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মা-বাবার শেষ বয়সের জীবন যাপন নিয়ে।

    সারের শুরুতে মা-বাবা থাকে অন্যের নিয়ন্ত্রণে। মাঝে থাকে সংসার নামক চাকার পিষনে আবার শেষ বয়সে এসে পড়ে নিয়ন্ত্রণহীন, গতিহীন, পরাধীন এক চক্রে। অনেকেই বলে থাকেন গরীবেরা অনেকাংশেই ভালো। তারা তো আর মা-বাবা কে দুরে ঠেলে দেয় না। আসলে কি বুঝেন তো শুন্য থালায় ভাগাভাগির ঝামেলা কম তাই সেখানে আবেগময় অনুভূতিগুলো খুব একটা প্রশ্রয় পায় না। তাই ওদের গল্প খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়।
    হয় তারা ভাগাভাগি করে না খেয়ে থাকে, না হয় নিজেরা কোন মতে খায় আর মা-বাবা চুলোয় যাক। আবেগের মুল্য দেয়ার সময় কোথায় ওদের? অর্থের কষাঘাতে আবেগ সেখানে মৃত প্রায়।

    কিন্তু, যত আবেগ বিবেক থাকে ভদ্রপাড়ায়। তাই সমস্যাগুলো ঘটে বেশি সেখানেই। পেটে ভাত পড়ে ফলে গায়ে শক্তি থাকে। তখন শুরু হয় মনের ঘরের চাওয়া পাওয়ার ঘাটতি। এবার দেখুন বাস্তবিক ধনীর ঘরের মা-বাবার বেশি বেশি বৈশিষ্ট্যের সুযোগ নেই। তারা হয় অনেক সুবিধা দিয়ে মা বাবাকে কাছেই রাখেন নচেৎ একেবারেই দুরে। তাই তাদের মা বাবার জীবনে ও তেমন কোন অভিযোগ বাক্স নেই যাতে তারা প্রতিদিনের কষ্ট সঞ্চয় করে রাখবে। বরং তাদের মাঝে সময় জ্ঞাপন হাহাকার, শুণ্যতা বয়ে যায়। তবু অভিযোগ নয়।
    অনেকেই বিশ্বাস করবেন না যে অর্থই সকল সুখের মূল। আমি আবার এটা ৯০ ভাগ বিশ্বাস করি। কেননা অর্থ থাকলে যে মানসিক শক্তি থাকে তা দিয়ে ও মনের চাহিদা অনেকাংশই কেনা যায়, তবে যে ১০ ভাগ এ আমার অভিযোগ তার জন্য দায়ী আবেগ ঘাটতি রোগ।

    কিন্তু, যারা ধনীর মতো জীবন যাপন করে তাদের সমালোচনা পুরো সমাজব্যাপী। যত গল্প, কবিতা, গান তাদেরই প্রাপ্য। কারণ কিন্তু একটাই। ধনীদের ন্যায় জীবন-যাপন করতে গিয়ে না আছে তাদের সময়, না আছে আবেগপূর্ণ বিবেক। আছে খানিকটা স্বার্থপরতা। মেকি সামাজের কাছে নতি স্বীকার করে তারা অর্থের পিছনে ছুটতে ছুটতে আর খোলস পড়া সামাজিকতা ও সৌন্দর্য্যের বেশভুষে ভুলেই যান যে তাদের মা বাবার সাথে কি কি করা উচিত নয়।

    এ প্রসঙ্গে একটু খোলাসা করেই বলি, যেমন কোন এক সন্তান তার বাড়ির ভৌত কাঠামোগুলো খুব সুন্দর, রুচিশীল ও শৈল্পিক সৌন্দর্য্যে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখেন আর এ কাজের প্রধান ভূমিকায় থাকেন সুগৃহিণী। কিন্তু সেই পরিবারের বাবা পরিপাটি করা খাবার টেবিলে বসে আজকাল আর ভালো করে খাবার খেতে পারে না। প্লেটের চারপাশে অনেক ভাত পড়ে যায় আবার বয়সের ভারে মনে রাখতে না পেরে খাবার মাখানো হাতেই গ্লাস, চামচ ধরে ফেলেন। এ নিয়ে সুগৃহিণীর নানান অভিযোগ বাবার নামে। সেই অবস্থায় সন্তানের ভূমিকা ইতিবাচক তাই নিরব থাকে অর্থাৎ বউ পক্ষে শান্তিময় পরিবেশ।

    এদিকে বাবা আজ শারীরিক, মানসিক সব শক্তি হারিয়ে হয়ে যান অসহায়। নচেৎ সন্তানের গালে একটা জোরে থাপ্পড় মেরে বলতো একসময় আমিও অনেক পরিপাটি ছিলাম এটা কি তুমি তোমার বউকে বলতে পারো না?
    আসুন এবার মায়ের গল্প করি। মা বেচারা অতিশয় সংসারী হয়ে এতটাই পাগলপ্রায় যে শেষ বেলাতে এসে আর মনে রাখতে পারে না যে এটা তার নিয়ন্ত্রণের সংসারটা আর নেই। তাই তিনি যখন তখন সবার কাজে বাগড়া দিয়ে বসেন। কখনো এটা করো না, কখনো ওটা করা উচিত, এটা হয়নি, ওটা করো কিংবা কখনো কখনো নিজ অধিকার বলে ক্ষমতা প্রয়োগ করেই বসেন। ব্যস!! সেখানেই যতদোষ।

    তাই তো সারাদিনের বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতায় মা-বাবার রোল প্লে খুব একটা মুখরোচক নয়। শেষ বেলায় এসে মা বাবাকে যে নতুন পাঠশালায় ভর্তি হতে হয় তা তারা ঠিক মতো গুছিয়ে উঠতে পারে না।

    সংসারের এসব বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণই হচ্ছে আমরা জন্মথেকেই ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় বেড়ে উঠি না। আমাদের পরিবার, সমাজ, সামাজিকতায়, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ব্যবহারিক প্রয়োগ খুব বেশি ধর্মীয় নয়। প্রত্যেকটা ধর্মের ধর্মগ্রন্থই কিন্তু মানবতার গান গায়। সহনশীলতা, ভদ্রতা, শালীনতা, সামাজিকতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারই হচ্ছে ধর্মগ্রন্থ।
    এছাড়াও আরও একটা বিষয় মা বাবার শেষ বয়সের কষ্টের কারণ তা হচ্ছে সংসারের দায়িত্ব থেকে ছুটি পেয়েই অবসর যাপনে চলে যান। ফলে অবসরে অন্যের দেয়া কষ্টগুলো সামান্য হলেও বড় আকারে ভাবনায় চেপে বসে। আসলে কি মানুষের জীবনে অবসর বলে কিছু আছে?

    আল্লাহতায়ালা পাঠিয়েছেনই অনবরত কিছু কাজ করে আখের গোছানোর জন্য। মানুষ যখন অবসরে যায় তখন হাতে থাকে অফুরন্ত সময়। তাই তখন বসে বসে শুধু অন্যের কাছ থেকে পাওয়া না পাওয়ার ফাঁকা চাহিদা নিয়েই বেশি কষ্ট পায়। আমরা যখন ছোট থাকি তখন খেলাধুলা, পড়াশোনা, গান বাজনা, বন্ধু বান্ধব, হইহুল্লোড় নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাই। আবার যখন বড় হয় তখন অর্থ উপার্জন, সংসারের দায় দায়িত্বসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকি কিন্তু সেই মানুষগুলোই শেষ বয়সে এসে নিজেদের অসুস্থ জীবন যাপনের দিকে ঠেলে দেয়।
    শিশু, কিশোর, বয়সের ন্যায় না হোক, কোন না কোন কাজে তো নিজেদের ব্যস্ত রাখতে পারি। এজন্য অবশ্যই আবার সন্তানরাই দায়ী। একসময়ে মা বাবা সন্তানের ভালো থাকার জন্য অনেক কিছু করেন তেমনভাবেই সন্তান কেউ মা-বাবার জন্য কিছু সুযোগ করে দেয়া। বৈচিত্রময়তা মানুষকে বাঁচতে শেখায়। শেখায় ভালো চিন্তা ধারা নিয়ে যাপন করতে। তাই সন্তানদের ভাবা উচিত কোন পরিবেশে কি কি বৈচিত্রতা আনয়ন করে মা বাবাকে কিছুটা আনন্দময় ব্যস্ত জীবন দেয়া যায়।

    উনাদের সম্মতিক্রমে ছোটদের সাথে কিছু কাজ দেয়া যায়, আবার মা-বাবার বন্ধু গ্রুপ করে দেয়া যায়। যাদের সাথে তারা প্রাতভ্রমণে বের হতে পারে, বিভিন্ন সময় একত্রিত হয়ে হাসি আনন্দ, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা, অসহায় বন্ধুদের কাজে সাহায্য করা, কেউ অসুস্থ হলে তাকে সময় দেয়া, এই রকম বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তাদের সময়গুলো মুল্যবান করে তুলতে পারে তাতে ভালো থাকবে আর তৃপ্তি ও পাবে।

    জানি এই বয়সে এমন কোন পদক্ষেপ নিতে তারা সাহস পাবে না কিন্তু বুঝতে হবে এসব কাজে যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন কাজ করবে। আবার সকল কে যে শিক্ষিত হতে হবে তাও যেমন নয়, তেমন সবারই যে অর্থ থাকতে হবে তাও কিন্তু নয়। এ বয়সের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে মানিয়ে নেয়া। তাই তারা ইচ্ছে করলেই কিন্তু এসব আনন্দময় কাজগুলো করতে পারে। তবে এর জন্য অবশ্যই দরকার সন্তানদের সহযোগিতা। এতে আমরা ও বিবেকের দংশনে পুড়লাম না আর উনারাও শেষ দিনগুলো ব্যস্ততায় কাটাতে পারলো।
    আমার কিন্তু আরও একটা ভিন্ন মত রয়েছে এই বয়সকে নিয়ে। মানুষ যখন অবসরে থাকে তখন তারা তাদের অতীত আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প করতে পছন্দ করে। শুধু গল্প নয়, তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটা সিরিয়াসও। আর এজন্যই এ বয়সে থাকা উচিত কিছু বন্ধু। যখন অনেকগুলো কাছাকাছি বয়সের মানুষ এক জায়গায় তাদের দুঃখ, কষ্ট, সুস্থতা, অসুস্থতা, ভালোলাগা, মন্দলাগাগুলো শেয়ার করবে তখন ওরা খুব সহযোগী হয়ে উঠবে।

    তাই, তারা যদি এক জায়গায় থেকে সময়গুলো ভাগাভাগি করতে পারতো তাহলে অন্যের অসুস্থতা, অসহায়ত্বে সেবাদানে পিছু পা হতো না। আমরা যদি এখন থেকেই ভাবতে শিখি যে অনেক তো হলো সংসার সংসার খেলা এখন আর সংসারে পিছুটান নয় নিজের জন্যও কিছুটা ভাবি। একসাথে দল বেঁধে হাঁটা, সময় পেলেই গল্প করা, হাসি আনন্দ আর অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে যাওয়া এরই মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেয়।

    মানুষ শেষ বয়সে ভাবে যে অনেক করেছি আর নাহ বাবা! এই ভাবনায় তাদের বিষন্নতায় নিয়ে যায় করে তুলে অসুস্থ হোক তা শারীরিক বা মানসিক। তাই আমরা কোনভাবেই যদি নিজেদের একটা দল বানাতে না পারি তাহলে শেষ বয়সের সবচেয়ে ভালো স্কুল কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমই।
    যেমনটি চায় ঠিক তেমন ভাবেই পথ চলতে পারি। একজাতীয় কিশোর বয়সের হোস্টেল জীবন পার্থক্য শুধু এটাই কিশোর বয়সে বাড়ি ফেরার ঝোক কম থাকে আর এই বয়সে বেশি। এক সময় সব অভ্যাস হয়ে যাবে তবুও আনন্দে।

    বৃদ্ধাশ্রমে আসলে কারা যায় আর কাদের রাখা হয় বলুন তো? নিশ্চয় ওই ভদ্র পাড়ার মা-বাবাদের। তাই নয় কি? তাহলে অবসরকে কিছুটা আনন্দঘন আর উদার ভাবে কাটানোর জন্য এটিই উত্তম। সবার তরে সবাই মোরা। এমন মানসিকতা বৃদ্ধ বয়সে সবারই থাকে।
    তাই কাছাকাছি বয়সের মানুষ যখন একই স্থানে একই পরিবেশে থাকবে তখন অন্যের আপদে বিপদে সহযোগিতা করার জন্য একটা চমৎকার প্লাটফর্ম হচ্ছে এই বৃদ্ধাশ্রম। যদি তা ভালো না লাগে তবে ভালো থাকার মুলমন্ত্র হচ্ছে যেসব সংসার আর সংসারের দায়িত্ব এক সময় আমার ছিল আজ তা অন্যের। এই ব্রত নিয়ে পিছন ফিরে না দেখা। সংসারের অন্যান্য সদস্যদের প্রধান কাজ হচ্ছে বয়স্কদের ভীষণভাবে ছাড় দেয়া ও সহযোগিতা করা।

    স্বপ্নচাষ/আরএস

    Facebook Comments

    বাংলাদেশ সময়: ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০

    swapnochash24.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  

    সম্পাদক : এনায়েত করিম

    সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: গুরুদাসপুর, নাটোর-৬৪৩০
    ফোন : ০১৫৫৮১৪৫৫২৪ email : swapnochash@gmail.com

    ©- 2020 স্বপ্নচাষ.কম কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।