• রবিবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম

    স্বপ্নচাষ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন  

    সন্দেহ হয় এটা তদন্ত নাকি স্বার্থান্বেশী মহলের কুটচাল?

    সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৪:০০ অপরাহ্ণ

    সন্দেহ হয় এটা তদন্ত নাকি স্বার্থান্বেশী মহলের কুটচাল?

    বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সংক্ষেপে ‘ইউজিসি’ দেশের সকল সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এই কমিশনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সুশাসন ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ও উদ্ভাবনী গবেষণায় উৎকর্ষতা অর্জন, টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সার্বিক সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করা।

    জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার গুরুত্বকে অনুধাবন করেছিলেন। তার এই অনুধাবনবোধ থেকেই ১৯৭৩ সালের ১০ নং আদেশের মাধ্যমে এটি সৃষ্টি হয় ঠিকই কিন্তু ইউজিসি’কে বিশেষ সম্মান দেখিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিজয় দিবস ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে এই কমিশন কার্যকর করেন তিনি।

    সময়ের সাথে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিধি ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করায় বর্তমানে ইউজিসির কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেগুলো হলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান, উচ্চ স্তরের শিখন-শেখানো পদ্ধতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়তা প্রদান, সর্বোচ্চ উদ্ভাবনী গবেষণা ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সুশাসন সংক্রান্ত বিষয়সমূহের উন্নয়ন ঘটানো। এছাড়াও ইউজিসি উচ্চশিক্ষার নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে মান নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী সরকারকে পরামর্শ প্রদান করে থাকে।

    ইউজিসি গঠন করলেও বঙ্গবন্ধু ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩’ আইন জারি করেন। এই আইনটি ছিল ব্যাপকভাবে গণতান্ত্রিক ও অংশীদারিত্বমূলক। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য। একারনে The University Grant Commission of Bangladesh Order, 1973 (The University Grant Commission of Bangladesh {Amendent} Act, 1998)-এ; এই চার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের কোন ক্ষমতা ইউজিসি’র আছে কিনা আমার জানা নেই। এমন কি দেশের যেকোন উপাচার্যকে অভিশংসন বা হয়রানি করার ক্ষমতাও তাদের দেওয়া হয় নাই। তবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করতে পারবে।

    এখানে বিশেষ ভাবে বলা প্রয়োজন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইন দ্বারা পরিচালিত হতো সে আইনগুলোকে বলা হতো কালো আইন। ওই আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনরকম স্বাধীনতা ছিল না। সরকার নিয়োজিত উপাচার্যের তখন প্রচন্ড- দাপট এবং সীমাহীন ক্ষমতা ছিল। উপাচার্যের কথার বাইরে শিক্ষকদের যাওয়ার কোন উপায় ছিল না। তিনি যাকে ইচ্ছে বিভাগীয় প্রধান করতে পারতেন, যাকে ইচ্ছে অনুষদসমূহের ডিন নিয়োগ দিতে পারতেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নানারকম চাপের মধ্যে দিন কাটাতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছিল এক অস্বস্তিকর জীবন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণমুখী অধ্যাদেশ প্রণয়নের দাবি ওঠে। অধ্যাদেশের দাবিতে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শুরু হয় আন্দোলন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতারা। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সমন্বয়ে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। ১৯৭২-৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর মনোয়ার হোসেন।

    বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন, শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। কারণ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ষাটের দশকের শিক্ষা বিষয়ক আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও ছিল স্বর্ণোজ্জ্বল ভূমিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই মুক্তিকামী ছাত্রদের পরিচর্যা করেছেন, শিক্ষকগণই ছাত্রদের দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য গণতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সমিতিসমূহ ও শিক্ষকদের কাছ থেকে মতামত আহবান করে বঙ্গবন্ধু সরকার। এসব প্রস্তাব পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি আলাদা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। যা ছিল ব্যাপকভাবে গণতান্ত্রিক ও অংশীদারিত্বমূলক। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

    ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অধ্যাদেশ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ ও শিক্ষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এ আইনে বিভাগ ও ইনস্টিটিউট পরিচালনার দায়িত্বে উপাচার্য কর্তৃক চেয়ারম্যান/পরিচালক নিয়োগ প্রথা চালু করা হয়। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক তিন বছরের জন্য এ নিয়োগ পান। মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী বয়োজ্যেষ্ঠকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়ার নিয়ম হয়। একাডেমিক কাজের পরিকল্পনা ও অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য বিভাগের সব শিক্ষককে নিয়ে গঠিত ‘একাডেমিক কমিটি’ এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য বিভাগের এক-তৃতীয়াংশ বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষককে নিয়ে গঠিত হয় ‘সমন্বয় ও উন্নয়ন কমিটি’। বিভাগীয় চেয়ারম্যান এসব সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়ন করেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হলে চেয়ারম্যানকে এসব কমিটিতে জবাবদিহি করার ব্যবস্থা রাখা হয়, এমনকি তাঁকে অভিশংসনের নিয়মও রাখা হয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার অবসান ঘটে। নির্বাচনের মাধ্যমে ডিন নিয়োগের প্রথা চালু হয়। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী সংস্থা সিন্ডিকেটে সব স্তরের শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সংস্থা সিনেটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক প্রতিনিধি, প্রাক্তন ছাত্রদের তথা জনগণের প্রতিনিধি, অধিভুক্ত কলেজগুলোর প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধি, জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি এবং বর্তমান ছাত্রদের প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় সংসদের আদলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সংসদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আলাদা সমিতি গঠন এবং প্রতি বছর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এসব সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্বাহী কমিটিগুলোর সদস্য করা হয়। একাডেমিক কার্যক্রমের নির্বাহী সংস্থা হিসেবে একাডেমিক কাউন্সিলে অনুষদের ডিন এবং বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান/পরিচালক ও সব অধ্যাপকদের পাশাপাশি যাতে তরুণ শিক্ষকদেরও মতের প্রতিফলন ঘটাতে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখার বিধান করা হয়। কোনো শিক্ষার্থীর একাডেমিক অসদাচরণ বা পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্য সব স্তরের প্রতিনিধিত্বমূলকভাবে শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করা হয়। কারও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি নিয়ে তদন্ত কমিটি এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রেখে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কে গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালনার জন্য যা কিছু করার দরকার তার সবই করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য নির্বাহীর মতো উপাচার্যকেও জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা হয়। তারমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জবাবদিহিতার জন্য ইউজিসি’র প্রয়োজন হয়না ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অধ্যাদেশ’ই যথেষ্ট।

    গত কয়েকদিন পত্রিকায় দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ ১৭টি বিষয়ে শিক্ষকদের একাংশের দেওয়া অভিযোগ আমলে নিয়ে গণশুনানি করতে যাচ্ছে ইউজিসি। ইউজিসির জেনারেল সার্ভিসেস অ্যান্ড এস্টেট ডিভিশনের সিনিয়র সহকারি পরিচালক গোলাম দস্তগির স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গণশুনানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। শুনেছি এই কোভিট পরিস্থিতিতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ইউজিসি অডিটোরিয়ামে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। সেখানে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তদের উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে ইউজিসি। সেদিন( ১৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩ টায় অভিযোগ দলিলপত্রসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। নোটিশে জানানো হয়, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এম আবদুস সোবহান ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্য এবং উপাচার্য কর্তৃক মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ধোঁকা দেওয়া ও শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করে উপাচার্যের মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ প্রদান, এডহক ও মাস্টাররোলে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্য, উপাচার্যের বাড়ি ভাড়া নিয়ে দুর্নীতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ লংঘন করে বিভিন্ন বিভাগের সভাপতি নিয়োগ ইত্যাদি অভিযোগসমূহ তদন্ত করার নিমিত্তে কমিশন কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আপনাদের সাক্ষাতকার গ্রহণের জন্য তদন্ত কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

    পত্রিকার পৃষ্ঠায় অবাক হয়ে দেখলাম- গত ০৪ জানুয়ারি উপাচার্যের দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত সংবলিত ৩০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মজিবুল হক আজাদ খান সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, শিক্ষামন্ত্রণালয়, ইউজিসিসহ চার দপ্তরে আমরা অভিযোগ দিয়েছিলাম। সেই অভিযোগ আমলে নিয়ে অভিযোগ তদন্তের জন্য ইউজিসি একটা গণশুনানির আয়োজন করেছে। সংবাদটি দেখে মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে মনেহয় এই প্রথমবার শিক্ষক, এডহক ও মাস্টাররোলে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে। যাক সেকথা যেহেতু রাবি’র উপাচার্য নিজেই দুর্নীতির বিপক্ষে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তাই সকল প্রশ্নের উত্তর তিনিই ভালো দিতে পারবেন। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনিই ভালো উত্তর দিতে পারবে।

    শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসাবে কষ্ট পেয়েছি কারন ইউজিসি’র একজন সিনিয়র সহকারী পরিচালক যা একেবারেই একটি এন্ট্রি লেভেলের পোষ্ট এবং উপাচার্যের সমমর্যাদা সম্পন্ন ইউজিসি’র দুইজন সম্মানিত সদস্য সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যা আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে আইনসিদ্ধ নয়। আইন অনুযায়ী তদন্ত কমিটির সদস্যবৃন্দের মর্যাদা উপাচার্যের মর্যাদার এক ধাপ উপরে হওয়া বাঞ্ছনীয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তথা আচার্য কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত তাই শুধুমাত্র নিয়োগকর্তা দ্বারা সম্পন্ন করা আইনসিদ্ধ। কিন্তু আইন বহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক একজন সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও উপাচার্যের সমমর্যাদা সম্পন্ন দুইজন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি কর্তৃক তদন্তকার্য পরিচালনা শুধু বেআইনিই নয় বরং এর মাধ্যমে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকেও খর্ব করা হয়েছে। লক্ষ্য করে দেখবেন সচিবালয়ের সব চিঠিতে উল্লেখ থাকে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’। এক বক্তব্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি হাস্যরস করে বলেছিলেন, সব চিঠিতেই লেখা থাকে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’। আমি কি যে আদেশ দিই আর কি আদেশ দিই না! তা আমি নিজেই জানিনা!

    শুধু তাই নয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগে বিচারাধীন আছে। একই বিষয় নিয়ে তদন্ত বা প্রশ্ন উত্থাপন করা আদালত অবমাননার সামিলও বটে। এঘটনায় আমি মনেকরি ইউজিসি শুধু একজন উপাচার্যকে নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে অপদস্থ করেছে। বর্তমান উপাচার্য চিরদিন উপাচার্য থাকবেন না। আজ যে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ ত্রিপক্ষিয় গণশুনানির জন্য উদ্যত। মনেরাখবেন আপনাদের মধ্য থেকেই কেউ একদিন উপাচার্য হবেন। একজন উপাচার্য শুধু একটি ব্যক্তি নয় একটি প্রতিষ্ঠান। আপনাদের কাছে অনুরোধ তাকে ছোট করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ছোট করে ফেলবেন না।

    গণশুনানির অর্থ হলো জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়, ঘটনা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ বা ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, মতামত ইত্যাদি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে শোনা ও কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার যথাসম্ভব প্রতিকার করা। কোনো কোনো অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধানও করা হয়, প্রচলিত দাপ্তরিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় যার সমাধান হতে অনেক সময় লেগে যেত, হয়তো কোনো দিনই যার সমাধান হতো না। আমার প্রশ্ন হলো ইউজিসি কি গণঅভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে সক্ষম?

    গঠনতন্ত্র মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ১ জন চেয়ারম্যান ,৫ জন পূর্ণকালীন সদস্য ও ৯জন খন্ডকালীন সদস্য নিয়ে গঠিত। সকল সদস্য কি ইউজিসিতে আছে? সকল সদস্য কি প্রফেসর ক্যাটাগরি সিলেকশন গ্রেড-১? আমার জানামতে প্রফেসর ক্যাটাগরি গ্রেড-৩ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকও ইউজিসি’র সদস্য হয়েছেন। এখন কি আমরা বললো, ইউজিসি’র সদস্য মনোনয়নেও স্বজনপ্রিতী হয়েছে? আপনারা কি আমাকে বলতে পারেন এই অভিযোগ কি কোথায় করা যায়?

    যাক সেকথা শুনেছি গনশুনানিতে রাবি উপাচার্যের আপত্তি নাই। তাই আমারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আপত্তি হলো একটা জায়গায় ‘ঢাকায় ডেকে শুনানি’। ‘০৯ সালের পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি’র তদন্ত কমিটির সকল সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করেছেন। রাবির ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে অবজ্ঞা করার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কি’বা হতে পারে? বোধকরি এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মসম্মানের প্রশ্ন। পত্রিকায় দেখলাম ইউজিসি’র একজন সদস্য জুম অ্যাপের মাধ্যমে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে উন্মুক্ত শুনানি করতে চায়। তাই সন্দেহ হয় এটা তদন্ত নাকি স্বার্থান্বেশী মহলের কুটচাল?

    পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, উন্নয়ন কাজের অসম বণ্টন, চাকরির ক্ষেত্রে বঞ্চনা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল এদেশের জনগণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা ছিল এক্ষেত্রে অত্যন্ত বলিষ্ঠ। উন্নয়ন ও শিক্ষার পশ্চাৎপদতার কারণে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে এটিই ছিল স্বাভাবিক। সারা দেশের মানুষ তখন তাকিয়ে থাকত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর দিকেই। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের আন্দোলন দানা বেঁধেছিল এ বিশ্ববিদ্যাগুলোকে ঘিরেই। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতি পাকিস্তান সরকারের মনোভাব ছিল অত্যন্ত কঠোর। আইনের যাঁতাকলে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল সরকার। এ লক্ষ্যে তারা তাদের মনের মতো করে ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইন প্রণয়ন করেছিল, যেটাকে কালাকানুন বলে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন। আশাকরি ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সেই পুরনো পথে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন না।

    ইউজিসি’র চেয়ারম্যান মহোদয়ের প্রতি বিশেষ অনুরোধ অভিযোগ স্থলে তদন্ত করান। মনে রাখবেন আপনারা কোন বিশেষ বাহিনীর সদস্য নন জাতির সর্বচ্চো শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের শিক্ষা গুরু। আপনাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে, সাবেক শিক্ষা সচিবের মেয়ে সচিব থাকা অবস্থায় আপনারা খোদ ইউজিসিতে নিয়োগ দিলেন কোন এখতিয়ারে? যা একটি অবান্তর প্রশ্ন হবে। মনেরাখবেন দেশের সর্বচ্চো শিক্ষা গুরুরা নিজেদের মধ্যে কাদা ছুড়াছুড়ি করলে তৃতিয় পক্ষ সুবিধা নেবে। যা রাষ্ট্রের জন্য সুখকর কিছু বয়ে আনবে না। কেউ অপরাধী হলে অবশ্যই শাস্তি দেন বা শাস্তির সুপারিশ করেন। কিন্তু সব বিষয় আমলে নিলে একজন উপাচার্যও তাদের মেয়াদ পূর্ণ অথবা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারবেন না। হুমকি–ধমকি না দিয়ে যত দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী করতে পারবেন, তত দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতির মঙ্গল হবে। যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের জন্য গনশুনানি অস্বস্তিকর বিষয়। দুঃখের বিষয় অন্যকে ছোট করার মাঝেই আমরা সমুদয় আনন্দ খুঁজে পাই! বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতে শিক্ষার ও গবেষণার মান উন্নয়ন হোক আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ। যা হবে নৈতিকতা ও মানবিক মুল্যবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এই নিবন্ধের যে আলোচনা রাখা হলো তা একান্তই আমার নিজস্ব ও ব্যক্তিগত চিন্তাপ্রসূত, কোনো দলীয় বা গ্রুপের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত নয়। এই আলোচনায় কাউকে কষ্ট দেওয়া আমার মনের অভিপ্রায় নয়। কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি তার কাছে আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

    লেখক : ঢাকা মহানগর বঙ্গবন্ধু পরিষদের আহ্বায়ক ।

    (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

    স্বপ্নচাষ/আরএস

    Facebook Comments

    বাংলাদেশ সময়: ৪:০০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

    swapnochash24.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  

    সম্পাদক : এনায়েত করিম

    সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: গুরুদাসপুর, নাটোর-৬৪৩০
    ফোন : ০১৫৫৮১৪৫৫২৪ email : swapnochash@gmail.com

    ©- 2020 স্বপ্নচাষ.কম কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।